করোনার  দ্বিতীয় ধাপে মোবাইল ফোনে  আরো বেশি আসক্ত হতে পারে শিশু ও তরুণ যুবকরা


মোঃ আবদুল নাঈম মোহন    |    ১০:১৯ এএম, ২০২০-১২-০৩

করোনার  দ্বিতীয় ধাপে মোবাইল ফোনে  আরো বেশি আসক্ত হতে পারে শিশু ও তরুণ যুবকরা

প্রাণঘাতি মহামারি করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) প্রথম ধাপে, যেন থমকে গিয়ে ছিলো মানুষের জীবণযাত্রা। এখনও প্রতিদিনই মৃত্যুর মিছিলে যোগ হচ্ছে নতুন নতুন নাম। করোনা ভাইরাস নামক পাগলা ঘোড়ার লাগাম যেন কেউ ধরতেই পারছে না। তাইতো করোনার কাছে করুনা প্রার্থী আজও পুরো বিশ্ব। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশে মরণ থাবা বসিয়েছে প্রাণঘাতি অদম্য এই করোনা ভাইরাস। চলতি বছরের নভেম্বরের শেষ সাপ্তাহ থেকে, করোনা ভাইরাস আবারো দ্বিতীয় ধাপে দিন দিন জটিলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মহামারি করোনায় দেশে আক্রান্ত ও মৃত্যুও সংখ্যা আবারও বেড়ে চলছে।
তারপরও মানুষের মনে কাজ করছে না কোন প্রকার ভয়-ভীতি। তারপরও কোন প্রয়োজন ছাড়া, কারণে অকারণে অনায়াসেই মানুষ বেরিয়ে পড়ছে ঘরের বাহিরে। অনেকেই ধার ধারছেন না সরকার ঘোষিত স্বাস্থ্য নীতির। অবুঝ মানুষের কাছে যেন পরাজিত হয়ে পরছে প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরাও।
করোনায় নানাবিধ অর্থ-সামাজিক ও মনত্তাত্বিক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে মানুষের জীবন ও জীবিকায়। প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাস থেকে মানুষকে সুরক্ষিত রাখার জন্য সরকার, করোনার প্রথম ধাপে তিন মাসের বেশি লকডাউন ঘোষণা করে ছিল। তখন লকডাউন চলা কালীন সময়ে নি¤œবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছিল। সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে ব্যাপক ত্রাণ দেওয়া হয়েছিল। জনসাধারণের অসহযোগিতায় প্রথম ধাপে করোনা পরিস্থিতি তেমন একটা উন্নতি না হলেও, দেশের অর্থনীতির চাকা চালু রাখার লক্ষ্যে প্রথম ধাপের লকডাউন শীথিল করেছিল সরকার।
এদিকে শীত শুরু হওয়ার সাথে সাথে চলতি বছরের নভেম্বরের শেষ সাপ্তাহের দিকে নতুন করে আরোনা আক্রান্ত রোগী সনাক্তের পাশাপাশি বৃদ্ধি পাচ্ছে মৃত্যুর সংখ্যা। 
মহামারি করোনা ভাইরাসে প্রথম লকডাউনে ঘরবন্দি হয়ে পড়ে ছিলো শিশু-কিশোররা। আর তাতে মারাত্বক নৈতিবাচক প্রভাব পড়েছে শিশু-কিশোরদের উপর। বিশেষ করে শিশু-কিশোররা বাড়ির বাহিরে যেতে না পারায় এক প্রকার গৃহবন্দি জীবন-যাপন অতিবাহিত করে ছিলো। খেলা-ধুলা, পড়ালেখা, বন্ধুদের সাথে আড্ডা বন্ধ হয়ে পড়ায়, তাঁরা পড়েছেন মানসিক চাপেও। মহামারি করোনার প্রথম ধাপে শিশু-কিশোরদের অধিকাংশ সময়ই কেটে ছিলো, টিভি দেখে নয়ত বা বাবা-মার মোবাইল ফোনের (স্মার্টফোন) সেটের গেম খেলে বা কার্টুন দেখে।
শিশু-কিশোরদের হাতে মোবাইল ফোন দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে, দ্বিতীয় শ্রেণীর এক ছাত্রের অভিভাবক বলেন, ঘরে বন্দি থাকতে থাকতে ছেলে-মেয়েদের মন আস্তে আস্তে খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। তখন তারা সুযোগ পেলেই বাসা থেকে বাহিরে ছুটে যেতো। করোনা প্রথম ধাপে লকডাউনে তারা সারা দিন টিভি বা মোবাইল নিয়ে সময় কাটাতো। কিন্তু মোবাইল ফোনের কারণে সন্তানদের ক্ষতি হতো। তারপরও কিছু বলতে পারতাম না, কিছু করারও ছিলো না তখন। 
অনেক অভিভাবক আবার অন্য যুক্তি দিয়ে বলছে, সন্তানরা বা কোথায় যাবে.? স্কুল বন্ধ, করোনার প্রথম ধাবে যখন সরকার যখন লকডাউন দিয়ে ছিলো, তখন কোন প্রকার সুযোগ ছিলো না ঘরের বাহিরে যাওয়ার। সরকারের পক্ষ থেকে বার বার বলা হয়েছিলো, শিশু ও তরুণ যুবকদের ঘরে থাকতে। এখন তো ওদের খেলাধুলা করে সময় কাটানো কিংবা বিনোদন। দেশে মহামারি করোনা প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর, চলতি বছরের ১৭ মার্চের পরে, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। তাতে সবাই এক প্রকার  ঘর বন্দি হয়ে পড়েছিল।
মহামারি করোনার প্রথম ধাপে দীর্ঘ লকডাউনে দেশের শতকরা ৮০-৯০ ভাগ পরিবারের শিশুদের খেলনার তালিকায় প্রথম স্থানে ছিল মোবাইল ফোন বা স্মার্ট ফোন। সন্তানদের বায়না পূরণে মোবাইলে গেম, কার্টুন, ভিডিও ও গান শুনে অভ্যাসে পরিণত হয়েছিলো। গবেষণার তথ্য বলছে, মোবাইল ফোন (র্স্মাট ফোন) অন্য যে কোন মাদকের চেয়েও বেশি আসক্ত হচ্ছে শিশু ও তরুণ যুবকরা। আর আমরা না জেনে না বুঝে আমাদের সন্তানের মেধাশক্তি ধ্বংস করছি এই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে।
যদিও বা অনেক অভিভাবক যুক্তি দিয়ে বলছেন, মেধাশক্তি ধ্বংস নয় বরং কোন কোনো কোনো ক্ষেত্রে সন্তানদের মেধা শক্তি মোবাইলরের মাধ্যমে আরো বাড়ছে। অন্যদিকে আরো কয়েকজন অভিভাবক অভিযোগ করে বলেন, এককালে দাদী বা মায়ের মুখে রূপকথার গল্প শুনতে শুনতে শিশুরা খাবার খেত, ঘুমাতেও যেতে। আর এখন শিশুদের মোবাইল ফোনের আসক্তি, এমন পর্যায়ে গেছে যে, সাধারণ কোনো রুটিন কাজের জন্যও বাচ্চার মোবাইল ফোনের আবদার মানতে হচ্ছে।
এমনো অভিযোগ আছে যে, শুধু শহরে নয়, বিভিন্ন উপজেলার গ্রাম পর্যায়ে স্কুল পড়–য়া সন্তানদের বায়না মেটাতে বাবা-মাকে ধারদেনা করে হলেও, কিনে দিতে হচ্ছে দামি মোবাইল সেট। অনেক বাবা-মা সন্তানকে শান্ত রাখতে বা তাদের দাবি মেটাতে হাতে তুলে দিচ্ছেন স্মার্ট ফোনসহ আরো নানা ধরনের দামি সেট। এতে একদিকে বাবা-মায়ের নিশ্চিন্ত হলেও তাদের অজান্তেই নিজের সন্তানদের মেধাকে তারা ধ্বংস করছে।
এদিকে চিকিৎসকরা বলছেন, মোবাইল ফোন (স্মার্ট ফোন) শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক। মোবাইল ফোন থেকে নির্গত রশ্মি শিশুদের দৃষ্টি শক্তির ভীষণ ক্ষতি করে। যেসব শিশু দৈনিক পাচঁ-ছয় ঘন্টা মোবাইল ফোনে ভিডিও গেম খেলে, খুব অল্প বয়সে তারা চোখের সমস্যায় পড়তে হয়। আর সেদিন খুব বেশি দূর নয় যেদিন মোবাইল ফোনকে সিগারেটের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত করা হবে।