সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন নানিয়ারচরের প্রথম নারী ইউএনও


মাহাদি বিন সুলতান    |    ০৪:৩৪ এএম, ২০২১-০৬-২৮

সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন নানিয়ারচরের প্রথম নারী ইউএনও

 পার্বত্য জেলা রাঙামাটির প্রত্যন্ত নানিয়ারচরে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন উপজেলার প্রথম নারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শিউলি রহমান তিন্নী। অত্যন্ত দুর্গম ও পাহাড়ী কৃষি নির্ভর এই উপজেলার উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড এবং জনসেবায় তিনি রেখে চলেছেন অদম্য ভূমিকা।

এলাকাবাসীর কাছ থেকেও কুড়িয়েছেন প্রসংশার ফুলঝুরি। ২০১৯ সালের ২৮শে নভেম্বর যোগদান করেন নানিয়ারচর উপজেলার প্রথম নারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার।

মঙ্গলবার (১৫ জুন) সকালে উপজেলায় শিউলি রহমান তার নিজ কার্যালয়ে প্রতিবেদকের সাথে আলাপচারিতায় তুলে ধরেন তার সফলতা ও চেলেঞ্জিং অভিজ্ঞতার কথা। সহজভাবেই বললেন এই এলাকা নিয়ে তার পরিকল্পনার কথা। দায়িত্বে থাকাকালীন তিনি এই এলাকার উন্নয়নে কাজ করতে চান বলেও জানান এই প্রতিবেদককে।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায়, পাহাড় ধ্বস রোধে ঝুকিপূর্ণ এলাকা পরিদর্শণ, ভূমি ও গৃহহীনদের জন্য সরকারী ঘর নির্মাণকল্পে জায়গা পরিদর্শণ, গণশুনানির অংশ হিসেবে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ঘটনাস্থল পরিদর্শণসহ পাহাড়ি পরিবারসমূহের সামাজিক অনুষ্ঠানের নিমন্ত্রণেও ছুটে যান তিনি।

একজন নারী হয়েও দুর্গম পাহাড় মাড়িয়ে ছুটে যান এক এলাকা হতে অন্য এলাকা। সরকারী সকল সেবা পৌঁছে দিতে তিনি ছুটে যান জনসাধারণের দোরগোড়ায়। ক্লান্তহীনভাবে নিরলস কাজ করছেন পাহাড়ী বাঙ্গালীসহ সকল ধর্ম বর্ণ ও সকল শ্রেণী পেশার মানুষের জন্য। জানতে চাইলে কিভাবে একজন নির্বাহী অফিসার হয়ে উঠলেন সে গল্প জানালেন এক সন্তানের জননী শিউলি রহমান। শিউলি রহমান মাদারীপুর জেলার রাজৈর উপজেলার সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন।

বাবা ছিলেন অত্যন্ত সৎ একজন সরকারি চাকুরীজীবি। গৃহিনী মা ছয় বোন ও এক ভাই কে বুকে নিয়ে সংসার সামলেছেন। শিউলি রহমান ছিলেন বাবা মায়ের কনিষ্ট সন্তান। ছোট বেলায় লক্ষ্য করেন, পরিক্ষার ফলাফল হাতে পেয়েই মা ভীষণ খুশি। আর মা কে খুশি করতেই আপ্রাণ চেষ্টা করতেন ভাল ফলাফল হাতে পেতে। সফলতার সকল কিছুতেই অনুপ্রেরণা যোগাতেন তার মা। মা বাবার কথা মনে পড়তেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। তার সফলতার পেছনে তার মা বাবার পাশাপাশি তার ভাই বোনের অবদানের কথাও জানান তিনি। মাধ্যমিক শিক্ষার গন্ডি পেরিয়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটি এবং পরে লন্ডনের বার্মিংহাম ইউনিভার্সিটি থেকে শিক্ষা জীবন শেষ করেন শিউলি রহমান।

দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোন প্রকার বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে কিনা সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, নানিয়ারচর অনেক সুন্দর একটি উপজেলা। এখানে কাজ করতে গিয়ে অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। এখানে বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণ ও নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ বাস করে। কোন প্রকার বাধার সম্মুখীন নয়, বরং এখানে আমি সতঃফুর্তভাবে কাজ করতে পারছি। আমি সব সময় সৎ ভাবে এবং পরের উপকার হয় এমন কাজ করি।

সুতারাং আমার মনে হয়না কেউ আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করবে। উপজেলার ৩নং বুড়িঘাট ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ড ইসলামপুর এলাকার কবির হোসেন জানান, সরকারী সেবা নিতে এলে দ্রুততম সময়েই মেলে কাঙ্ক্ষিত সেবা। করোনাকালীন সময়ে ৪টি ইউনিয়নে ছুটে গিয়েছেন সরকারী ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দিতে। এনিয়ে সেবাগ্রহীতারাও বেশ সন্তোষ প্রকাশ করেন বলেও জানান এলাকাবাসী।

সম্প্রতি শিউলি রহমান পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতা, শততার নিদর্শন, নির্ভরযোগ্যতা ও কর্তব্যনিষ্ঠা, সহকর্মী ও সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে আচরণ, তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারে পারদর্শীতাসহ সরকারী ও দাপ্তরিক বিভিন্ন কার্যক্রমে তাকে জাতীয় শুদ্ধাচার পরষ্কারে পুরষ্কৃত করা হয়েছে। গত ২৪জুন রাঙামাটি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান তাকে উপজেলা পর্যায়ে (৫ গ্রেড) শুদ্ধাচার পুরষ্কার এর সনদ প্রদান করেন। উপজেলা পর্যায়ে তিনি জেলার শ্রেষ্ঠ ইউএনও নির্বাচিত হয়েছেন।

এবিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিবেদককে তিনি বলেন, "জাতীয় শুদ্ধাচার পুরষ্কার আমার জন্য একটা উল্লেখযোগ্য অর্জন। এখন থেকে দায়িত্ব আরো বেড়ে গেল। পুরষ্কার পাওয়ার চেয়ে এই পুরস্কার ধরে রাখাটাই আসল কথা। এই পুরষ্কার আমার সামনের দিন গুলোতে সফলতার দারপ্রান্তে পৌঁছাতে সহায়ক হবে।" নানিয়ারচরর উপজেলা নিয়েও শিউলি রহমান জানালেন তার কিছু পরিকল্পনার কথা। নানিয়ারচর আনারসের রাজধানী হলেও আনারস নিয়ে নেই নান্দনিক কোন নিদর্শন।

উপজেলাটিকে পর্যটনবান্ধব হিসেবে উপস্থাপনে তার রয়েছে কিছু ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। নানিয়ারচর উপজেলায় শুয়ে আছেন দেশের ৭বীর সন্তানের একজন বীরশ্রেষ্ঠ মূন্সী আব্দুর রউফ। নানিয়ারচর সেতুর কাজ সম্পন্ন হলে এবং সাজেক থেকে লংগদু-নানিয়ারচর হয়ে হয়ে সরাসরি রাঙামাটি পৌঁছানো সম্ভব হলে এই এলাকায় নতুন পর্যটন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হবে। আর্থসামাজিক উন্নয়ন আসবে এই এলাকার বাসীন্দাদের মাঝে।

তিনি যেখানেই থাকবেন সময় পেলেই ছুটে আসবেন এই উপজেলায় এমনটাই জানালেন এই ইউএনও। উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক চেঙ্গী নদীর পাড়ে অবস্থিত নানিয়ারচর উপজেলায় আগেও নানিয়ারচরে ক'জন নারী নির্বাহী অফিসার যোগদান করেন। কিন্তু তারা ছিলেন অতিরিক্ত দায়িত্বে। এবারই প্রথম কোন নারী ইউএনও কে পূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়।