উন্নয়ন বোর্ডের উন্নয়নের চাবি কি ফিরবে রাজনীতিকদের হাতে?


নিজস্ব প্রতিবেদক    |    ০৮:৪৭ পিএম, ২০২১-০২-২৫

উন্নয়ন বোর্ডের উন্নয়নের চাবি কি ফিরবে রাজনীতিকদের হাতে?

পাহাড়ের আর্থ-সামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রধানতম সংস্থা পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড। এখানে বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকার উন্নয়ন বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বিশ্বব্যাংক ও ইউএনডিপিসহ উন্নয়ন সংস্থাগুলো থেকেও বরাদ্দ পাওয়া যায়। কিন্তু জনস্বার্থের এ উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক নেতৃত্বই অনুপস্থিত।

বোর্ডের বর্তমান চুক্তিভিত্তিক চেয়ারম্যানের মেয়াদ শেষ হচ্ছে মার্চে। প্রতিষ্ঠানটিকে জনসম্পৃক্ত করতে এ পদে নিয়োগ পেতে স্থানীয় রাজনীতিকদের অনেকেই তদবির করছেন। স্থানীয়রাও চাচ্ছেন আমলানির্ভর নয়, জনপ্রতিনিধির নেতৃত্বেই পরিচালিত হোক তাদের প্রাণের প্রতিষ্ঠানটি।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বিরাজমান জাতিগত সংঘাত নিরসনে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পাহাড়ের উন্নয়নের জন্য সরকারি সংস্থা হিসেবে ১৯৭৬ সালের ১৪ জানুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠার ৪৫ বছরের মধ্যে সাড়ে ৩২ বছরই বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার, সেনাবাহিনীর চট্টগ্রাম এরিয়া কমান্ডারসহ সরকারি আমলারাই নিয়োগ পেয়েছেন। আর তিন মেয়াদে মাত্র সাড়ে ১২ বছর বেসামরিক পর্ষদে চেয়ারম্যান ছিলেন দুই জনপ্রতিনিধি। অথচ যোগ্য যে কোনো ব্যক্তিকে বোর্ডের চেয়ারম্যান নিয়োগে আইনি কোনো বাধা নেই।

স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে চেয়ারম্যান না করায় উন্নয়নে যেমন জনসম্পৃক্ততা বেশি থাকছে না তেমনি জনআকাংক্ষাও পূরণ হচ্ছে না। পাহাড়ের শান্তি, উন্নয়ন, স্বার্থ নিশ্চিত ও প্রতিষ্ঠানটিকে জনবান্ধব করতে হলে পাহাড়ের মানুষকেই দায়িত্বে বসাতে হবে বলে মনে করছেন পাহাড়ের মানুষেরা। সরকারি আমলার পরিবর্তে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে, উপজাতি জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিচারে চাকমা সম্প্রদায় এবং বোর্ডের প্রধান কার্যালয় রাঙামাটিতে হওয়ায় সেখানকার বাসিন্দা থেকে চেয়ারম্যান নিয়োগ- এ তিনটি বিষয় বিবেচনার দাবি উঠেছে।
স্থানীয়রা বলছেন, উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান কার্যালয় রাঙামাটিতে হলেও সেখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে কাউকেই এ পর্যন্ত চেয়ারম্যান করা হয়নি।

এমনকি জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিচারে রাঙামাটিতে চাকমা সম্প্রদায়ের আধিক্য থাকলেও একবারও তাদের কাউকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়নি। তিন মেয়াদে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বর্তমান মন্ত্রী বান্দরবানের এমপি বীর বাহাদুর উ শৈ সিং এবং খাগড়াছড়ির বিএনপিদলীয় সাবেক এমপি ওয়াদুদ ভূঁইয়া নিয়োগ পেলেও তারা ছিলেন বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির বাসিন্দা। সবশেষ তিন দফায় নিয়োগ পাওয়া বর্তমান চেয়ারম্যান সরকারের আমলা নববিক্রম কিশোর ত্রিপুরাও খাগড়াছড়ির বাসিন্দা।

১৩ হাজার ২৯৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের পাহাড়ি ভূখন্ড রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম। আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে ব্রিটিশ ও পাকিস্তান শাসনামলে এ অঞ্চল ছিল বঞ্চিত। স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পশ্চাৎপদ পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি স্বতন্ত্র বোর্ড গঠনের প্রতিশ্রুতি দেন। ১৯৭৩ সালের ৯ আগস্ট তৎকালীন ভূমি প্রশাসন ও ভূমি সংস্কারমন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত রাঙামাটি সার্কিট হাউসে উন্নয়ন বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেন। বোর্ডের কার্যক্রম অধিকতর টেকসই, গতিশীল ও জনবান্ধব করার লক্ষ্যে সবশেষ ২০১৪ সালের ৮ জুলাই ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আইন-২০১৪’ প্রণয়ন করা হয়।

প্রতিষ্ঠানটি শুরু থেকেই ‘উন্নত সমৃদ্ধ পার্বত্য চট্টগ্রাম’ গড়তে এ অঞ্চলের অবকাঠামো ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বিশেষত যাতায়াত, ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষা, কৃষি, সমাজকল্যাণ, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি খাতে এবং সমন্বিত সম্প্রদায়ের উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের উন্নয়ন ও প্রচারে কাজ করছে।

শুরু থেকেই পদাধিকার বলে বিভাগীয় কমিশনার বা সেনাবাহিনীর চট্টগ্রাম এরিয়া কমান্ডার এ বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। এর মধ্যে ১৯৭৬ সালের ১১ জানুয়ারি থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত তিনজন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার এবং এর পর ১৯৯৮ সালের ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেনাবাহিনীর আটজন চট্টগ্রাম এরিয়া কমান্ডার ছিলেন বোর্ডের চেয়ারম্যান।

পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর প্রথমবারের মতো বীর বাহাদুর উ শৈ সিং এমপি ১৯৯৮ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০০১ সালের ২২ আগস্ট ও ২৯ মার্চ ২০০৯ থেকে ০১ ডিসেম্বর ২০১৩ পর্যন্ত দুই মেয়াদে প্রতিষ্ঠানটিতে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। এবং ২০০২ থেকে ২০০৬ সাল মেয়াদে দায়িত্বে ছিলেন ওয়াদুদ ভূঁঁইয়া। এ ছাড়া ২০০১-২০০২ এবং ২০০৬-২০০৯ মেয়াদে চেয়ারম্যান ছিলেন দুজন অতিরিক্ত সচিব ও দুজন মেজর জেনারেল।

২০১৩ সালের পর আবারও জনপ্রতিনিধিদের চেয়ারম্যান করার ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ে। রাষ্ট্রপতির কোটায় অতিরিক্ত সচিব হওয়া পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক নববিক্রম কিশোর ত্রিপুরা পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে নিয়োগ পান। একই সঙ্গে নিযুক্ত হন পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্র্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবেও। পরে চুক্তিভিত্তিক পূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন ২০১৩ থেকে ২০১৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর ২০১৮ সালের ১৯ মার্চ পুনরায় তিনি সচিব মর্যাদায় তিন বছরের জন্য বোর্ডের চেয়ারম্যান নিয়োগ পান। আগামী মার্চেই তার চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। তাই এরই মধ্যে বোর্ডের চেয়ারম্যান হতে তোড়জোড় শুরু করেছেন অনেকেই।

তাদের মধ্যে রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের দুই সহসভাপতি ও রাঙামাটি জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান নিখিল কুমার চাকমা ও চিংকিউ রোয়াজার নাম শোনা যাচ্ছে। পাহাড়ি-বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিখিল কুমার চাকমার বেশি গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। এ ছাড়া খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা ও খাগড়াছড়ির এমপি বাসন্তি চাকমাও তদবির করছেন। আবার তথ্য কমিশনের চেয়ারম্যান সুদত্ত চাকমাকেও কেউ কেউ চেয়ারম্যান করার চেষ্টা করছেন বলে শোনা যাচ্ছে।

দীর্ঘকাল ধরে ‘স্থানীয় রেওয়াজ’ অনুসরণ করা হয়েছে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে। চাকমা অধ্যুষিত রাঙামাটিতে চাকমা, ত্রিপুরা অধ্যুষিত খাগড়াছড়িতে ত্রিপুরা, ও মারমা অধ্যুষিত বান্দরবানে মারমা সম্প্রদায় থেকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এমনিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ এ রীতি অনুসরণ করে আসছে। কিন্তু এবার সেই রীতি ভেঙে সম্প্রতি পুনর্গঠিত তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে মারমা সম্প্রদায় থেকে। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ চাকমা ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সঞ্চার হয়েছে ক্ষোভের।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্ষীয়ান সাংবাদিক সুনীল কান্তি দে বলেন, ‘পার্বত্যবাসী মনে করে প্রতিষ্ঠানটিকে জনবান্ধব করতে হলে জনপ্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানে জনপ্রতিনিধিত্ব থাকা উচিত’। আওয়ামী লীগ নেতা ও রাঙামাটির আইনজীবী অ্যাডভোকেট বিপ্লব চাকমা বলেন, ‘জনপ্রতিনিধি ও রাজনীতিকদের জন্য উন্নয়ন বোর্ড। আমলারা দায়িত্বে থাকলে সাধারণ মানুষ ও রাজনীতিকরা কাছেও ঘেঁষতে পারেন না। আমলাদের জনসম্পৃক্ততা নেই। তাই জনপ্রতিনিধি ও রাজনীতিকদের মধ্য থেকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া এখন সময়ের দাবি’। শিক্ষাবিদ ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরূপা দেওয়ান বলেন, ‘মনোনীত ব্যক্তিদের জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা নেই। পাহাড়ে সব প্রতিষ্ঠানে নির্বাচন দরকার। বোর্ডেরও নির্বাচন দরকার। বর্তমান

চেয়ারম্যানের আমলে পাহাড়ে কিছুটা হলেও দৃশ্যমান উন্নয়ন দেখা গেছে। এটি অব্যাহত রাখতে যোগ্য ব্যক্তিকে চেয়ারম্যান করতে হবে’।
রাঙামাটি জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির (দুপ্রক) সাধারণ সম্পাদক ললিতচন্দ্র চাকমা বলেন, ‘জেলা পরিষদে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। কিন্তু আরও যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ ছিল। বান্দরবান, খাগড়াছড়ি থেকে উন্নয়ন বোর্ডে চেয়ারম্যান হলেও রাঙামাটিতে এ পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। সরকার বিষয়টি খতিয়ে দেখুক’।