চার দশকের শিক্ষকতা জীবন থেকে অবসরে যাওয়া শিক্ষকদ্বয়কে সংবর্ধনা


নিজস্ব প্রতিবেদক    |    ০৩:০৪ পিএম, ২০২৩-০৩-২৪

চার দশকের শিক্ষকতা জীবন থেকে অবসরে যাওয়া শিক্ষকদ্বয়কে সংবর্ধনা

রাঙ্গামাটির বরকল উপজেলার সুবলং ইউনিয়নস্থ বরুনাছড়ি জোন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ আফজাল হোসেন ও সহকারি শিক্ষক মোঃ আবদুল জলিল এর অবসরজনিত বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গত ২০শে মার্চ। বরুনাছড়ি জোন নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠ প্রাঙ্গণে অত্র বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, এস.এম.সি কমিটি ও এলাকাবাসীর উদ্যোগে এ বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।

সুবলং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তরুন জ্যোতি চাকমার সভাপতিত্বে এবং বরুনাছড়ি জোন স.প্রা.বি. এর সহঃ শিক্ষক হিরন কুমার অধিকারীর সঞ্চালনায় উক্ত মহতী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য সুবির কুমার চাকমা।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বরকল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আবদুস সালাম, এবং ইউ. আর. সি ইন্সট্রাক্টর মোঃ মোরশেদ আলম।

এছাড়া ও উক্ত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাঙ্গামাটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি বাবু অমল চাকমা, ৯নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, সুবলং ইউনিয়ন আওয়ামিলীগ সভাপতি মোঃ আবুল কালাম, বরুনাছড়ি জোন স.প্রা.বি এর বর্তমান এস.এম.সি কমিটির সভাপতি মোঃ মকিম হোসেন, সাবেক এস.এম.সি. সভাপতি মোঃ সোহরাব হোসেন, সহ.সভাপতি মোঃ পান্না মিয়া, বরুনাছড়ি জোন নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান শিক্ষক মোঃ কবির হোসেন প্রমূখসহ এলাকার বিভিন্ন গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকমন্ডলী, বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবকবৃন্দ।

প্রাক্তন শিক্ষার্থী হিসেবে উক্ত অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন মোঃ তৌহিদুল ইসলাম (প্র. শি. জগন্নাথছড়া স. প্রা. বি)। তিনি শিক্ষকদ্বয়ের বিভিন্ন স্মৃতিচারণা করে তাদের অবসরকালীন জীবনের মঙ্গল কামনা করেন এবং প্রধান অতিথির নিকট বিদ্যালয়ের জন্য একটি শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য অনুরোধ রাখেন। এছাড়াও উক্ত অনুষ্ঠানে প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন মোঃ আবুল কালাম।

তিনি বলেন, ১৯৮২-১৯৮৫ এই সময়ে আমি এই বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন ছাত্র ছিলাম। ছাত্র থাকাকালীন অবস্থায় দেখেছি আমার স্যাররা কতটা আন্তরিকতার সহিত পাঠদান করেছেন আমাদের। তিনি স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন আমি একবার "সকালে উঠিয়া মনে মনে বলি " কবিতাটি না পারায় জলিল স্যার আমাকে ক্লাসের মধ্যে সেটি শিখিয়ে তারপর ছুটি দিয়েছেন। বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি অনাড়ম্বরপূর্ণ হওয়ায় তিনি তাঁর বক্তব্যে আয়োজকদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং পরবর্তীতে আরো বড় পরিসরে এমন আয়োজন করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। উক্ত বিদ্যালয়ের আরেক প্রাক্তন শিক্ষার্থী মোঃ বেলাল হোসেন তাঁর বক্তব্যে বলেন, আজকে সমাজে আমাদের যতটুকুই অবস্থান তার পিছনে স্যারদের অবদান অনস্বীকার্য।

তিনি বলেন আমাদের হেড স্যার এবং সেকেন্ড স্যার শুধু বিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষেই তাঁদের পাঠদান সীমিত রাখেননি, হাটে, ঘাটে, মাঠে, পথে, প্রান্তরে,বাজারে যেখানেই সাক্ষাৎ হতো তাঁরা আমাদের পড়াশোনার খোঁজ খবর রাখতেন এবং কুশলাদি বিনিময় করতেন। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ইন্সট্রাক্টর জনাব মোরশেদ আলম প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সন্মানিত ডিজি মহোদয়ের বক্তব্যের উদ্ধৃতি টেনে বলেন, একজন শিক্ষকের শিক্ষাদানে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতার চেয়ে আন্তরিকতা মূখ্য ভূমিকা রাখে সে বিষয়টি এই শিক্ষকদ্বয় প্রমাণ করেছেন। তাঁরা বিভিন্ন প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে আধুনিক শিক্ষা উপকরণের ব্যবহারের উপযোগিতা না পেয়ে ও এই দূর্গম অঞ্চলে দীর্ঘ ৪ দশকের ও বেশি সময় ধরে শিক্ষার আলো ছড়িয়েছেন।

আরেক বিশেষ অতিথি UEO আব্দুস সালাম তাঁর বক্তব্যে বলেন, এই জনপদের মানুষকে সুশিক্ষিত করতে এই দুজন সাদামনের শিক্ষকের অবদান নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তাঁরা শুধু শিক্ষকতা জীবনেই সফল নন ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক জীবনে ও তাঁরা সফলতার স্বাক্ষ্য রেখেছেন নিজেদের ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষিত করে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন পরবর্তী প্রজন্ম এই শিক্ষার ধারা অব্যাহত রাখবেন এবং শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবেন। পরিশেষে তিনি শিক্ষকদ্বয়ের সুখী, সুন্দর জীবন প্রত্যাশা করেন।

প্রধান অতিথি সবির কুমার চাকমা তাঁর বক্তব্যে বলেন, "আজকের অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষন আমি নই বরং আফজাল স্যার এবং জলিল স্যারই হলেন আজকের অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষন। আজকে যদিও তাঁরা কর্মজীবন থেকে বিদায় নিচ্ছেন তথাপি সমাজ ও দেশকে দেয়ার এখন ও অনেক কিছু আছে তাঁদের। আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি তাদের অবসরকালীন জীবন যেন বসন্তের রঙ্গিন আভায় সুশোভিত হয়ে স্বার্থক ও সুন্দর হয়ে উঠে।" তিনি পূর্ববর্তী বক্তাদের দাবীর প্রেক্ষিতে আগামী অর্থবছরে বিদ্যালয়ের জন্য একটি শহীদ মিনার ও দুটি সিঁড়ি নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বক্তব্য শেষ করেন।

বিদায়ী প্রধান শিক্ষক মোঃ আফজাল হোসেন তার বক্তব্যে সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, "আমাদের ছাত্র-ছাত্রীদের সাফল্যে তাঁদের পিতা-মাতার মত আমরা ও সমান আনন্দিত এবং গৌরবান্বিত। আমি আশা করি গৌরবের এই ধারা আরো তরান্বিত হবে। " আরেক বিদায়ী শিক্ষক আবদুল জলিল বলেন, আমরা আমাদের ছাত্র-ছাত্রীদের সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সহিত পাঠদানের চেষ্টা করেছি। নানান প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে মাঝে মাঝে সেনাবাহিনীর সহযোগিতা নিয়ে ও ছেলেমেয়েদের পাঠদান করতে হয়েছে আমাদের।

বক্তব্য শেষে তাঁরা উভয়ই সকলকে এমন আয়োজন এবং উপস্থিতির জন্য ধন্যবাদ জানান এবং অবসরোত্তর জীবনের জন্য দোয়া কামনা করেন। উক্ত অনুষ্ঠানে বিদায়ী শিক্ষকদ্বয়ের উদ্দেশ্যে মানপত্র পাঠ করেন অত্র বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র জনাব, মোঃ কামরুল ইসলাম (রাজিব)। অনুষ্ঠান শেষে বার্ষিক ক্রিড়া প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মাঝে পুরষ্কার বিতরণ করা হয়। শিক্ষকদ্বয়ের বিদায় মুহুর্তে প্রকৃতি ও যেন শোকবিহ্বল হয়ে পরেছিল। বসন্তের ঝড় হাওয়া এবং বৃষ্টিস্নাত আবহাওয়া পুরো পরিবেশকে আর ও ভারী করে তুলেছিল সেদিন।