বাবা ছিলেন জিয়াউর রহমানের উপদেষ্টা, ছেলে দীপেন দেওয়ান তারেক রহমান সরকারের পূর্ণমন্ত্রী


নিজস্ব প্রতিবেদক    |    ১১:৩৮ পিএম, ২০২৬-০২-২১

বাবা ছিলেন জিয়াউর রহমানের উপদেষ্টা, ছেলে দীপেন দেওয়ান তারেক রহমান সরকারের পূর্ণমন্ত্রী

এম. আর. হোসাইন জহির

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের নতুন মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন রাঙামাটি আসন থেকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান। ১৭ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত মন্ত্রিসভায় তাকে পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ায় রাঙামাটিসহ পার্বত্য চট্টগ্রামজুড়ে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখা দিয়েছে।

দীপেন দেওয়ান এমন এক রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য, যার সঙ্গে বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের সম্পর্ক রয়েছে।

তার বাবা সুবিমল দেওয়ান ছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উপদেষ্টা। ফলে পারিবারিকভাবেই জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা দীর্ঘদিনের।

সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাঙামাটি আসন থেকে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার ভোটের বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করেন দীপেন দেওয়ান।

তিনি মোট ২ লাখ ১ হাজার ৮৪৪ ভোট পান। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী পহেল চাকমা পান ৩১ হাজার ১৪২ ভোট। এ বিপুল ব্যবধান তাকে দেশের অন্যতম আলোচিত প্রার্থী হিসেবে সামনে নিয়ে আসে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০০৬ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিচার বিভাগীয় চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দেন দীপেন দেওয়ান।

সে সময় তিনি চাঁদপুর জেলার যুগ্ম জেলা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

রাজনীতিতে যোগদানের পর তিনি রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং দীর্ঘদিন ধরে জেলার সাংগঠনিক কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।

বর্তমানে তিনি বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করছেন।

দলীয় নেতাকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই দশক ধরে রাঙামাটিতে বিএনপির রাজনীতি সংগঠিত ও শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন দীপেন দেওয়ান।

আওয়ামী লীগের শাসনামলে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনায় নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেও তিনি মাঠে সক্রিয় ছিলেন বলে দাবি করা হয়।

তার এ দীর্ঘ রাজনৈতিক তৎপরতা ও সাংগঠনিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে মনে করছেন নেতাকর্মীরা।

পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর দীপেন দেওয়ান বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছেন, তা আমার জন্য গর্বের।

দল ও সরকারের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখতে এবং প্রধানমন্ত্রীর হাতকে শক্তিশালী করতে আমি নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করব।

সবার সহযোগিতায় পাহাড়ে শান্তি, সম্প্রীতি ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে কাজ করতে চাই।”

এদিকে এবারের নির্বাচনে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি আসনেই বিএনপির প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন, যা দলটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অতীতে ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাঙামাটি থেকে মণিস্বপন দেওয়ান এবং খাগড়াছড়ি থেকে আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া নির্বাচিত হলেও বান্দরবানে দলীয় প্রার্থী পরাজিত হয়েছিলেন।

সে সময় রাঙামাটির মণিস্বপন দেওয়ান পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান এবং আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়াকে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত পার্বত্য শান্তিচুক্তির প্রেক্ষাপটে ১৯৯৮ সালে গঠিত এ মন্ত্রণালয়ের প্রথম পূর্ণমন্ত্রী হন তৎকালীন আওয়ামী লীগের খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য কল্প রঞ্জন চাকমা (১৯৯৮–২০০১)। ২০০৭–২০০৮ সালে ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার রাজা দেবাশীষ রায়।

পরবর্তীতে ২০০৮–২০১৪ সালে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন দীপংকর তালুকদার। ২০১৪–২০১৮ সালে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন বীর বাহাদুর উশৈসিং।

এরপর ২০১৮–২০২৩ মেয়াদে তিনি পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে খাগড়াছড়ির কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরাকে প্রতিমন্ত্রী করা হয়।

একই বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান সাবেক রাষ্ট্রদূত সুপ্রদীপ চাকমা।

নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দীপেন দেওয়ানের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তি পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে।

এখন দেখার বিষয়, পাহাড়ের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও উন্নয়নসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তিনি কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পারেন।