সীমান্ত থেকে কাপ্তাই হ্রদ হয়ে পাঁচার হচ্ছে অবৈধ সিগারেট; সিগারেটভর্তি ডাম্পারসহ আটক-২


আলমগীর মানিক    |    ০৩:০২ পিএম, ২০২৬-১০-০৭

সীমান্ত থেকে কাপ্তাই হ্রদ হয়ে পাঁচার হচ্ছে অবৈধ সিগারেট; সিগারেটভর্তি ডাম্পারসহ আটক-২

আলমগীর মানিক

কাপ্তাই-চট্টগ্রাম সড়ককে ব্যবহার করে অবৈধ সিগারেট পাচারের একটি চালান আটকের পর নতুন করে সামনে এসেছে পার্বত্য অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ সড়কপথে চোরাচালানের রুট ব্যবহারের বিষয়টি। রাঙামাটির কাপ্তাই ব্যাটালিয়ন (৪১ বিজিবি) রাঙ্গুনিয়া উপজেলার চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের ইকো পার্ক এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রায় ৮৩ লাখ টাকার অবৈধ সিগারেট সহ একটি ডাম্পার ট্রাক আটক করেছে। এ সময় আটক করা হয়েছে দুইজনকে।

বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (৭ অক্টোবর) ভোর ৪টার দিকে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এ অভিযান চালানো হয়। অভিযানে ডাম্পার ট্রাকে তল্লাশি চালিয়ে ১৭ হাজার ৯০ প্যাকেট প্যাট্রন (Patron) এবং ১ হাজার ৮০০ প্যাকেট অরিস (Oris) সিগারেট উদ্ধার করা হয়। সব মিলিয়ে উদ্ধার হওয়া সিগারেটের পরিমাণ ১৮ হাজার ৮৯০ প্যাকেট, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৮৩ লাখ ৩ হাজার ৪০০ টাকা।

অভিযানে তৌহিদুল ইসলাম (২১) ও সাহেদুর ইসলাম নয়ন (২২) নামে দুইজনকে আটক করা হয়। তৌহিদুল রাঙ্গুনিয়ার নিশ্চিতপুর গ্রামের নাজিম উদ্দীনের ছেলে এবং সাহেদুর ইসলাম নয়ন শিলক গ্রামের মৃত মোহাম্মদ আলীর ছেলে।

বিজিবি জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া সিগারেটগুলো সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে কাপ্তাই লেক হয়ে কাপ্তাই-চট্টগ্রাম সড়ক দিয়ে পাচার করা হচ্ছিল। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে রাঙ্গুনিয়ার ইকো পার্ক এলাকায় চালানটি আটক করা হয়।

এখানেই চোরাচালানের রুট নিয়ে প্রশ্ন উঠছে সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে কাপ্তাই লেক হয়ে বিপুল পরিমাণ সিগারেট কীভাবে সড়কপথে প্রবেশ করছে এবং এত দূর পর্যন্ত পরিবহন হচ্ছে? এ ঘটনায় আটক দুই ব্যক্তির বাইরে এই চালানের উৎস, গন্তব্য, অর্থের জোগানদাতা এবং এর সঙ্গে আরও কারা জড়িত! এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

একটি ডাম্পার ট্রাকে করে এত বিপুল পরিমাণ সিগারেট পরিবহনের ঘটনাও আলাদা করে গুরুত্ব পাচ্ছে। সাধারণ নির্মাণসামগ্রী পরিবহনে ব্যবহৃত এ ধরনের ভারী যানবাহনের আড়ালে চোরাচালানের পণ্য পরিবহন করা হয়ে থাকলে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

উদ্ধার হওয়া সিগারেটের আনুমানিক মূল্য ৮৩ লাখ ৩ হাজার ৪০০ টাকা। অর্থাৎ একটি চালানেই বিপুল অঙ্কের অবৈধ পণ্য পরিবহনের চেষ্টা হয়েছে। ফলে এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ছোটখাটো পাচার নাকি বড় কোনো চোরাচালান নেটওয়ার্কের অংশ—সেটিও এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বিশেষ করে চালানটির উৎস ও গন্তব্য শনাক্ত করা গেলে এই চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত নেটওয়ার্ক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। একই সঙ্গে সিগারেটের চালানটি কোথায় নেওয়া হচ্ছিল, কার কাছে পৌঁছানোর কথা ছিল এবং পরিবহনের জন্য ডাম্পারটি কীভাবে ব্যবহৃত হলো; এসব প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন।

কাপ্তাই লেক এবং কাপ্তাই-চট্টগ্রাম সড়ক পার্বত্য রাঙামাটি ও চট্টগ্রামের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। এই রুটে স্থলপথের পাশাপাশি জলপথও ব্যবহৃত হয়। ফলে অবৈধ পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে জলপথ ও সড়কপথকে সমন্বিতভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেটিও নজরদারির বিষয় হয়ে উঠেছে।

কাপ্তাই ব্যাটালিয়ন (৪১ বিজিবি) জানিয়েছে, সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত আভিযানিক টহলের মাধ্যমে চোরাচালানবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাওসার মেহেদী বলেন, সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি ও নিয়মিত আভিযানিক টহলের মাধ্যমে চোরাচালানবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

আটক দুই ব্যক্তি, উদ্ধার হওয়া সিগারেট ও ডাম্পার ট্রাক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য রাঙ্গুনিয়া থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।

তবে এই ঘটনায় শুধু চালান আটক ও দুইজনকে গ্রেপ্তারেই তদন্ত সীমাবদ্ধ না রেখে সিগারেটের উৎস, সরবরাহকারী, পরিবহনকারী, সম্ভাব্য ক্রেতা ও পুরো চোরাচালান চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করা যায় কি না! এখন সেটিই দেখার বিষয়।বিপুল অর্থমূল্যের এ ধরনের চালান আটক হলেও যদি মূল হোতারা আড়ালে থেকে যায়, তাহলে একই রুটে চোরাচালান বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

সংশ্লিষ্ট্য একটি বিশ্বস্থ সূত্র জানিয়েছে, এই অবৈধ ভারতীয় সিগারেটগুলো রাতের অন্ধকারে কাপ্তাই হ্রদ দিয়ে জুরাছড়ি উপজেলা থেকে পাঠিয়েছে জনৈক পূর্ণ বিকাশ চাকমা। এই পূর্ণ বিকাশই এখন রাঙামাটির বিভিন্ন রুটে ভারতীয় সিগারেট পাচারের মূল হোতা; জুড়াছড়ি থেকে সিগারেটগুলো বালুখালীতে আসে। সেখান থেকে জণৈক জুগেষ চাকমা রাঙামাটির বিভিন্ন চক্রের কাছে সিগারেটগুলো পৌছে দেয়।

বুধবার ভোরে আটককৃত সিগারেটগুলো জুড়াছড়ি হয়ে বালুখালী রুট দিয়ে কাপ্তাইয়ের ব্যঙ্গছড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে রাতের অন্ধকারে গাড়ি ভর্তি করা হয়। রাঙামাটির রাজবাড়ি, ভালেদী, পুরাতনবস্তী ব্রীজ, আসামবস্তি প্রযুক্তি এলাকা, নোয়াআদাম, ব্যঙছড়ি এলাকা দিয়ে কাপ্তাই হ্রদ হয়ে সিগারেট নিয়ে আসে পাচারকারিরা। 

রাঙামাটি শহর থেকেও পণ্যপাচারের নামে বিশেষ কায়দায় তৈরি কাভার্ড ভ্যানের মাধ্যমেও সিগারেট পাচার হচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে। জানাগেছে, কাভার্ড ভ্যানের বাইরের বডির সাথে ভেতরের বডি পরিমাপ করলেই ধরা পড়বে আসল চিত্র। কারণ ভেতরে আলাদা বক্স তৈরি করে সেগুলোর ভেতরে সিগারেট পাচার করে সিন্ডিকেট চক্র।

কলেজ গেইটের তালিকাভূক্ত দুই চোরাকারবারি সম্প্রতি একটি নতুন কাভার্ড ভ্যান বানিয়েছে শুধুমাত্র সিগারেট পাচারের জন্য। প্রশাসনের নমনীয়তায় এসব চোরাকারবারিদের সাথে আতাঁত করে সিগারেটের আড়ালে অস্ত্র-গুলি পাচার করছে আঞ্চলিকদলগুলো এমন তথ্যও সাম্প্রতিক সময়ে উঠে এসেছে।