কাপ্তাইয়ে আপস্ট্রিম জেটিঘাটের ইজারা টেন্ডার ঘিরে উত্তেজনা ! কমদামে ইজারা দেয়ার চেষ্টার অভিযোগ
অহিদুল ইসলাম অভি |
০৫:৩৫ পিএম, ২০২৬-০৭-২৯
আলমগীর মানিক
রাঙামাটির কাপ্তাই আপস্ট্রিম জেটিঘাটের ইজারা দরপত্রকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। দরপত্র জমা দিতে বাধা, টেন্ডার শিডিউল ছিঁড়ে ফেলা এবং প্রতিনিধিকে আটকে রাখার অভিযোগে লিখিত আবেদন করেছেন ফয়সাল এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আব্দুল্লাহ আল কাইসার চৌধুরী। তবে অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন দাবি করে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন অভিযুক্ত বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো) সিবিএ (রেজি. নং-১৮৮৬)-এর সভাপতি মো. বেলাল। ইতোমধ্যে ঘটনাটি তদন্তে একটি কমিটি গঠন করেছে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ এবং তদন্ত প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
লিখিত অভিযোগে আব্দুল্লাহ আল কাইসার চৌধুরী জানান, গত ২১ জুন ২০২৬ কাপ্তাই আপস্ট্রিম জেটিঘাটের ইজারা সংক্রান্ত দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল দুপুর ১২টা ১৫ মিনিট এবং দরপত্র খোলার সময় ছিল দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট। তিনি ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত থাকায় তাঁর প্রতিনিধি মো. মোজাফফর হোসেনকে দরপত্র জমা দেওয়ার দায়িত্ব দেন।
অভিযোগে বলা হয়, প্রতিনিধি সকাল ১১টা ৫০ মিনিটে ডেপুটি ম্যানেজারের কার্যালয়ে পৌঁছালে মো. বেলাল এবং তাঁর সঙ্গে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি দরপত্র জমা দিতে বাধা দেন। পরে প্রতিনিধিকে একটি কক্ষে আটকে রেখে টেন্ডার শিডিউল ছিঁড়ে ফেলা হয় এবং সঙ্গে থাকা পে-অর্ডার ফেরত দেওয়া হয়। অভিযোগকারীর দাবি, পুরো ঘটনাটি সিসিটিভি ফুটেজে সংরক্ষিত রয়েছে এবং তা পর্যালোচনা করলে ঘটনার সত্যতা পাওয়া যাবে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ঘটনার পর উপ-ব্যবস্থাপক (যান্ত্রিক সার্ভিস) প্রকৌশলী মো. সাইফুর রহমানকে বিষয়টি জানালে তিনি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন। এরপর জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিক সহায়তা পাওয়া যায়নি। পরে কাপ্তাইয়ের রণজয়ী ৩৮ জোন সেনাবাহিনীকে বিষয়টি অবহিত করা হলে তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত মো. বেলালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে তিনি বলেন, "আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। এখানে সব ধরনের তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। তদন্তে যদি আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে কর্তৃপক্ষ যে শাস্তি দেবে আমি তা মেনে নেব। আর যদি অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তাহলে আমার মানহানির জন্য আমি আইনের আশ্রয় নেব।"
তিনি আরও বলেন, "অভিযোগকারী ও আমরা একই এলাকার মানুষ, পাশাপাশি বাড়ি। আমাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ নেই। আমি একজন সরকারি চাকরিজীবী এবং সিবিএ নেতা। টেন্ডারবাজির সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমাকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে এই অভিযোগ করা হয়েছে।"
ঘটনার পরপরই কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক অভিযোগের বিষয়ে তদন্তে একটি কমিটি গঠন করেন।
তদন্ত কমিটির সদস্য ও কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক সংরক্ষণ বিভাগ-১) মোহাম্মদ কায়ছুল বারীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, "আমি দুই দিন আগেই তদন্ত প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছি। তদন্তে আমরা সিসিটিভি ফুটেজসহ সব ধরনের আলামত ও তথ্য-প্রমাণ যাচাই করেছি। এখন বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।" তবে তদন্ত প্রতিবেদনে কী সুপারিশ করা হয়েছে! এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানতে কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
এদিকে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, গত অর্থবছরে জেটিঘাটটি ২৫ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ইজারা দেওয়া হলেও এবার একটি পক্ষের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে কম মূল্যে ইজারা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, গতবারের ইজারাদাররা এবার ৩২ লাখ ৮৫ হাজার টাকার দরপত্র জমা দিতে চাইলেও সেটি জমা দিতে না দিয়ে ছিঁড়ে ফেলা হয়। এতে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে তারা দাবি করেছেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি ইজারা সাধারণত প্রতি বছর প্রায় ১০ শতাংশ হারে মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। কিন্তু এবার সেই বৃদ্ধি তো দূরের কথা, আগের বছরের তুলনায়ও কম মূল্যে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে, যা সরকারের রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করেছে।
দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, কয়েক বছর আগে একই জেটিঘাটের ইজারামূল্য ছিল প্রায় ১৭ লাখ টাকা। পরে তা বেড়ে ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় পৌঁছায়। কিন্তু এবার রহস্যজনকভাবে কম দামে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে কম দামে ইজারা দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এদিকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়ার পর এখন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহল।