মেঘ–পাহাড়–ঝরনার টানে ভিড় বাড়ছে তিন পার্বত্য জেলায়


সিয়াম    |    ০৯:২৮ পিএম, ২০২৬-০১-১০

মেঘ–পাহাড়–ঝরনার টানে ভিড় বাড়ছে তিন পার্বত্য জেলায়

শীত মৌসুম শুরু হতেই বাংলাদেশের পার্বত্য তিন জেলা—খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে বেড়েছে পর্যটকদের সমাগম।

পাহাড়ের মনোরম আবহাওয়া, নির্মল বাতাস ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন ভ্রমণপিপাসুরা।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই বাড়তি পর্যটক প্রবাহ পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে এবং সৃষ্টি করছে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ।

পর্যটন সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা জানান, ট্যুরিস্ট পুলিশ ও জেলা পুলিশের সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার হলে চলতি মৌসুমে পাহাড়ে পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়বে।

এতে হোটেল-মোটেল, পরিবহন, গাইড ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি শীতে সবচেয়ে বেশি পর্যটক যাচ্ছেন খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে।

এর মধ্যে সাজেক ভ্যালি রয়েছে শীর্ষে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সহজ যাতায়াত সুবিধাই সাজেকের জনপ্রিয়তা বাড়ার অন্যতম কারণ।

পর্যটকরা খাগড়াছড়ি হয়ে সাজেকে যাচ্ছেন, ফলে আলুটিলা, রিছাং ঝরনা, জেলা পরিষদ পার্কসহ খাগড়াছড়ির অন্যান্য দর্শনীয় স্থানেও বাড়ছে ভ্রমণকারীর সংখ্যা। পর্যটকদের আগমনে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টগুলো।

পাহাড়ঘেরা অরণ্য, ঝিরি, ঝরনা আর উপত্যকার সৌন্দর্য দিন দিন আরও বেশি মানুষকে আকৃষ্ট করছে। প্রতিবছরের মতো এবারও শীতকালজুড়ে পার্বত্যাঞ্চলের পর্যটন স্পটগুলোতে প্রাণচাঞ্চল্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

ভ্রমণকারীরা বলছেন, পাহাড়ের আবহাওয়া শীতকালে সবচেয়ে উপযোগী থাকে। পরিবার কিংবা বন্ধুদের নিয়ে দলবদ্ধভাবে ঘুরতে পাহাড়ই এখন তাদের প্রথম পছন্দ।

নির্মল বাতাস, মুক্ত পরিবেশ আর অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেশের অন্য কোনো জায়গায় সহজে মেলে না। পাশাপাশি পাহাড়ি অঞ্চলের বাহারি খাবারও পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের ধারণা, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত পর্যটকদের আগমন অব্যাহত থাকবে।

খাগড়াছড়ি ট্যুরিস্ট পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্রে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

সাজেকগামী পর্যটকদের যাতায়াতেও সহায়তা দিচ্ছে ট্যুরিস্ট পুলিশ ও জেলা পুলিশ। অন্যদিকে পার্বত্য জেলা পরিষদের কর্মকর্তারা জানান, পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পর্যটন মোটেল ও অবকাঠামো উন্নয়নে নিয়মিত কাজ করা হচ্ছে।

রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায় অবস্থিত সাজেক ভ্যালি দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। এটি রাঙামাটি জেলার সর্বউত্তরে মিজোরাম সীমান্ত ঘেঁষে অবস্থিত।

উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা, দক্ষিণে রাঙামাটির লংগদু, পূর্বে ভারতের মিজোরাম এবং পশ্চিমে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা—এই চার দিকের প্রাকৃতিক পরিবেশ সাজেককে দিয়েছে অনন্য সৌন্দর্য।

সাজেক বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন, যার আয়তন প্রায় ৭০২ বর্গমাইল। প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী, এখানে পাহাড়ধস বা বড় ধরনের প্রাকৃতিক ঝুঁকির আশঙ্কা তুলনামূলক কম। সারাবছরই সাজেকে ভ্রমণ করা যায়।

সাজেক মূলত রুইলুইপাড়া ও কংলাক পাড়া—এই দুই পাড়ার সমন্বয়ে গঠিত। রুইলুই পাড়ার উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১ হাজার ৭২০ ফুট এবং কংলাক পাহাড় প্রায় ১ হাজার ৮০০ ফুট উঁচু।

এখানে লুসাই, পাংখোয়া ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বসবাস বেশি। সাজেকের কলা ও কমলা স্থানীয়ভাবে বেশ জনপ্রিয়। সাজেককে বলা হয় ‘রাঙামাটির ছাদ’, কারণ এখান থেকে রাঙামাটির বিস্তীর্ণ অংশ চোখে পড়ে।

খাগড়াছড়ি সদর থেকে সাজেকের দূরত্ব প্রায় ৭০ কিলোমিটার এবং দীঘিনালা থেকে প্রায় ৪৯ কিলোমিটার। যদিও সাজেক প্রশাসনিকভাবে রাঙামাটিতে অবস্থিত, তবে যাতায়াতের সবচেয়ে সহজ পথ খাগড়াছড়ি দিয়েই।

সাজেক ভ্রমণের জন্য স্থানীয় জিপগাড়ি, যা ‘চান্দের গাড়ি’ নামে পরিচিত, সবচেয়ে নিরাপদ ও জনপ্রিয় মাধ্যম। অভিজ্ঞ চালক ছাড়া ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে পাহাড়ি পথে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

পথে বাঘাইহাট এলাকায় হাজাছড়া ঝরনার সৌন্দর্যও অনেক পর্যটক উপভোগ করেন। সাজেকে বিদ্যুৎ সংযোগ সীমিত, তাই বেশিরভাগ কটেজে সোলার সিস্টেম ব্যবহার করা হয়। পানির সরবরাহও কিছুটা সীমিত হওয়ায় পর্যটকদের সচেতন থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।

সাজেকের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এখানকার প্রকৃতির বৈচিত্র্য। দিনে কখনো রোদ, কখনো বৃষ্টি, আবার হঠাৎ চারপাশ ঢেকে যায় মেঘে—মনে হয় যেন এক মেঘের উপত্যকা।

তিনটি হেলিপ্যাড থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের দৃশ্য সত্যিই মোহময়। রুইলুই পাড়া থেকে ট্রেকিং করে কংলাক পাহাড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা পর্যটকদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ। পথে দেখা যায় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, সীমান্তবর্তী পাহাড় আর মেঘের আনাগোনা।

সাজেকের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীরা অত্যন্ত অতিথিপরায়ণ। তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনধারার প্রতি সম্মান জানানো প্রত্যেক পর্যটকের দায়িত্ব।

স্থানীয় উৎসবের সময় পর্যটকরা পাহাড়ি সংস্কৃতির নানা দিক কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান—যা পাহাড় ভ্রমণকে করে তোলে আরও অর্থবহ ও স্মরণীয়।