রাঙামাটিতে ৩ জনের ধর্ষণে প্রতিবন্ধী মারমা নারী অন্ত:সত্তা; প্রথা আইনে রেহাই

আলমগীর মানিকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

আলমগীর মানিক    |    ০৫:০৭ পিএম, ২০২৫-১০-১৯

রাঙামাটিতে ৩ জনের ধর্ষণে প্রতিবন্ধী মারমা নারী অন্ত:সত্তা; প্রথা আইনে রেহাই

আলমগীর মানিকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

 

পাহাড়ে ‘সামাজিক বিচার’-এর নামে নারীর প্রতি সহিংসতা ও বিচারবহির্ভূত প্রথার ভয়াবহ দৃষ্টান্ত আবারো উঠে এসেছে। এবার সামাজিক বিচারের নামে এক প্রতিবন্ধি মারমা এক নারীকে ধারাবাহিক ধর্ষনের মাধ্যমে ৫ মাসের গর্ভবতী করে দেওয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত তিনজনকে মাত্র ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করে রেহাই দিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলাধীন চিৎমরম ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের চংড়াছড়ি মুখ এলাকায় শুক্রবার ১৭ই অক্টোবর এই বিচারের ঘটনা ঘটে। 

বিচারকদের রায়ে বলা হয়েছে জরিমানার অর্থের মধ্যে ৩লাখ টাকা ভিকটিমের অনাগত সন্তানের জন্য ব্যাংকে রাখা হবে এবং বাকি টাকা দিয়ে প্রথানুসারে সমাজের জন্য বন্যা বা শুকর ক্রয়ের জন্য ব্যয় করা হবে। এই ক্ষেত্রে ভিকটিম নারীর কাছ থেকেও ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় সামাজিক বিচারে।

অভিযুক্তরা হলো (১) অনুচিং মারমা(৫০) (২) কালা মারমা (৫৫) ও (৩) মং উ মারমা (৩৫)। অভিযুক্ত তিনজন এবং ভিকটিম সকলেই মারমা সম্প্রদায়ের বলে প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি সিং থোয়াই উ মারমা। 

অভিযুক্তদের ধর্ষণে উক্ত প্রতিবন্ধি মারমা নারী বর্তমানে ৫ মাসের অর্ন্তসত্তা হলেও সন্তানের পিতা কে সেটি নির্দিষ্ট্য করতে জানাতে পারেনি। ভিকটিম বিচারকদের জানিয়েছে তার সাথে অভিযুক্ত তিনজনই প্রতিনিয়ত রাত কাটিয়েছে।  

৩নং চিৎমরম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বাবু ওয়েশ্লিমং চৌধূরীর কাছে মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে প্রতিবেদককে বলেন, বিচার হয়ে যাওয়ার পরে আমি ঘটনাটি শুনেছি। তিনি বলেন, এলাকার কার্বারীরা এই বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন। 

স্থানীয় আমছড়ি পাড়ার সরকারীভাবে নির্ধারিত দায়িত্বপ্রাপ্ত কার্বারী থুইচা প্রু মারমা প্রতিবেদককে বলেন, প্রথম বৈঠকের দিন আমাকে ডেকে নেওয়া হয়েছিলো। সেই বৈঠকে সকলের তথ্য সঠিক মনে না হওয়ায় আমি তাদেরকে তিনদিন সময় বেধে দিয়ে চলে এসেছিলাম। পরবর্তীতে আমি আর যেতে পারিনি। কিন্তু আমার এই ঘটনায় বিচার করে দিয়েছে বলে আমি জেনেছি। 

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বেসরকারিভাবে বোমাং সার্কেল কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত কার্বারী অংমা খৈ মারমা, প্যানেল চেয়ারম্যান সাবেক মেম্বার ও কার্বারী সিং থোয়াই উ মারমা ও মংনু চিং মারমা এই তিনজনের নেতৃত্বে এই সামাজিক বিচার কার্যক্রম পরিচালিত হয়। 

বিচারকারি কার্বারী ও প্যানেল চেয়ারম্যান সিং থোয়াই উ মারমার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি প্রতিবেদককে বলেন, আমরা বিষয়টি সামাজিকভাবে সমাধান করে ফেলছি। বিস্তারিত জানতে চাইলে প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ভিকটিম মহিলাটি ষোলআনা সুস্থ নয়; বারো আনার মতো সুস্থ। একজনের সাথে সম্পর্ক করতে দেখে অন্য আরেকজনে তার সাথে সম্পর্ক করে; এভাবে তিনজনের সাথেই উক্ত নারীর সম্পর্ক গড়ে উঠে। একপর্যায়ে মহিলাটি গর্ভবর্তী হয়ে পড়ে। 

চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে উক্ত ভিকটিম নারীর পেট ব্যথা শুরু হলে তার পেটে টিউমার হয়েছে বলে জানালেও এক পর্যায়ে একজন গ্রাম্য ধাত্রী উক্ত ভিকটিম গর্ভবর্তী বলে জানালে বিষয়টি জনসম্মুখে উঠে আসে। এরপর আমরা স্থানীয় তরুন-তরুনীদের সম্পৃক্ত করে ১৫ জনের কমিটি করে সামাজিকভাবে বসে ভিকটিমকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি তিনজন অভিযুক্তকে শনাক্ত করে দেখান। এরপর সংশ্লিষ্ট্যরা সকলে তাদের অপরাধ স্বীকার করলে আমরা সকলেই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়ে অপরাধকারি তিনজনকে প্রতিজন এক লাখ ১০ হাজার টাকা করে মোট তিন লাখ ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করে রায় দিই। 

এই ঘটনায় উক্ত ভিকটিমকেও ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে জানিয়ে সিং থোয়াই উ মারমা কার্বারী বলেন, আমরা উক্ত জরিমানার অর্থগুলো থেকে তিন লাখ টাকা অনাগত বাচ্চাটির জন্য ব্যাংকে ডিপোজিট করে রাখা হবে আর আমাদের সমাজের প্রথা-রীতিমতো বন্যা(শুকর) দিতে হয় তাই সমাজের জন্য তিন অপরাধীর কাছ থেকে ৩০ হাজার এবং ভিকটিমের কাছ থেকে ৫ হাজার মোট ৩৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছি। 

এই ৩৫ হাজার টাকা দিয়ে সমাজের জন্য শুকর কিনা হবে বলেও জানিয়ে তিনি বলেন, অনাগত বাচ্চাটির কোনো দোষ নাই। তাই তার সুস্থভাবে ডেলিভারির পাশাপাশি ভবিষ্যত লালনপালনের জন্য আমরা তিন লাখ টাকাগুলো রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই জরিমানা টাকাগুলো আদায়ে সংশ্লিষ্ট্য অভিযুক্তদেরকে তিনমাস সময় দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। 

নির্মম এই ঘটনাটি শুনেই চন্দ্রঘোনা থানা পুলিশের একটি টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে ভিকটিম ও তার পরিবারকে থানায় এসে লিখিত অভিযোগ দিতে অনুরোধ করলেও অজ্ঞাত কারনে এখনো পর্যন্ত তারা থানায় অভিযোগ দায়ের করেনি বলে প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেছেন চন্দ্রঘোনা থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ শাহজাহান কামাল। 

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, উক্ত এলাকাটি পাহাড়ের একটি প্রভাবশালী আঞ্চলিকদলের সশস্ত্রবাহিনীর দখলে থাকায় তাদের চাপে ভিকটিম পরিবারটি আইনের আশ্রয় নিতে পারছেনা বলে জানিয়েছে এলাকার স্থানীয় সূত্র। নিরাপত্তা বাহিনীর একজন উদ্বর্তন কর্মকর্তা বিষয়টি স্বীকার করে প্রতিবেদককে বলেন, ঘটনাটি প্রচার হলে প্রথমেই উক্ত এলাকায় একটি টিম ঘটনাস্থলে গেলেও সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের ব্যাপক উপস্থিতিতে এবং তাদের প্রত্যক্ষ বাধার কারনে ভিকটিমকে উদ্ধার করে থানায় আনতে পারেনি। 

ভিকটিমের একমাত্র মা ও ভাই ছাড়া আর কেউই তার পাশে নেই এবং ভিকটিম একজন প্রতিবন্ধি নারী মন্তব্য করে একজন স্থানীয় বাসিন্দা প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, অভিযুক্তরা সকলেই আঞ্চলিকদলের রাজনীতির সাথে জড়িত তাই প্রভাবশালী আঞ্চলিক দলের প্রত্যক্ষ চাপে ভিকটিম অন্তসত্তা নারী ৫ মাসের পেটের সন্তানের পিতা কে এবং তাকে ধারাবাহিকভাবে ধর্ষণকারি তিন অভিযুক্তের বিচার দাবি করতে পারছে না।

স্থানীয় মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এই ঘটনা পাহাড়ে ‘সামাজিক বিচার’-এর নামে নারীর প্রতি সহিংসতা ও বিচারবহির্ভূত প্রথার ভয়াবহ দৃষ্টান্ত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা এবং প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ ছাড়া এমন অনৈতিক বিচার সংস্কৃতি বন্ধ করা সম্ভব নয়।