রাজস্থলী ৫০শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার,স্বাস্থ্য কর্মকর্তার স্বীকারোক্তি


আজগর আলী খান    |    ০৩:২১ পিএম, ২০২৬-১০-২২

রাজস্থলী ৫০শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার,স্বাস্থ্য কর্মকর্তার স্বীকারোক্তি

রাঙ্গামাটির রাজস্থলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবার মান, চিকিৎসক ও কর্মচারীদের কর্মস্থলে উপস্থিতি, ওষুধ সরবরাহ, রোগীবাহী গাড়ির ব্যবহার এবং হাসপাতালের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

বিশেষ করে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ উত্তোলন, রোগীদের খাবার সরবরাহে অনিয়ম, জেনারেটর ব্যবহার না করা, তেলের বরাদ্ধ আত্মসাৎ করা এবং প্রয়োজনের সময় রোগীবাহী গাড়ির চালককে না পাওয়ার, সরকারি কর্মকর্তার গাড়ী এলাকার বাহিরে নেওয়া সব কিছুর অভিযোগে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও রোগীদের স্বজনেরা।

অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় কয়েকজন কর্মচারীর প্রভাব এবং দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের সুযোগকে কেন্দ্র করে দাপটের সহিদ নানা অনিয়মের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।

এমনকি হাসপাতালের কিছু আর্থিক কার্যক্রম ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো, হাসপাতালের বিভিন্ন খাতে নামে-বেনামে বিল তৈরি এবং আপ্যায়ন ও অন্যান্য ব্যয়ের ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি কোষাগার থেকে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।

এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নওশাদ খান সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের কথা স্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে।

তিনি এটিকে নিয়মবহির্ভূত বলেও উল্লেখ করেন। তবে এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট বিল-ভাউচার, ক্রয়সংক্রান্ত নথি, সরকারি কোষাগার থেকে অর্থ উত্তোলনের হিসাব, উপস্থিতি রেজিস্টার এবং অন্যান্য প্রশাসনিক নথি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

১০ শয্যা থেকে ৫০ শয্যা, তবু সেবার মান নিয়ে প্রশ্নঃ- রাজস্থলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি উপজেলার সাধারণ মানুষের সরকারি চিকিৎসা সেবার অন্যতম প্রধান ভরসা।

প্রায় ৪০ হাজার মানুষের স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন মেটাতে এ প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু হাসপাতাল টির শয্যাসংখ্যা ১০ থেকে ৫০-এ উন্নীত হওয়ার পরও চিকিৎসাসেবার মান, জনবল ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

রোগী ও তাঁদের স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে অনেক সময় প্রত্যাশিত সেবা পাওয়া যায় না।

চিকিৎসক বা সংশ্লিষ্ট কর্মীদের খুঁজে পেতে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। প্রয়োজনীয় ওষুধ সব সময় পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে অনেক রোগীকে বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে।

বিশেষ করে জরুরি রোগীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

কোনো রোগীর উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কিংবা চন্দ্রঘোনা খ্রিষ্টিয়ান হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর প্রয়োজন হলে দ্রুত পরিবহন নিশ্চিত করা জরুরি।

কিন্তু রোগীবাহী গাড়ির চালককে সময়মতো পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন,একটি সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক, কর্মচারী, ওষুধ, রোগীবাহী গাড়ি এবং জরুরি সেবার ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও রোগীদের কেন বারবার ভোগান্তিতে পড়তে হবে?

সরেজমিন পরিদর্শনে উঠে আসে নানা অভিযোগঃ-গত ১৪ অক্টোবর সকাল ১০টার দিকে হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবা ও ব্যবস্থাপনা পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শনে যান সাংবাদিকেরা। এ সময় রোগী ও তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে বিভিন্ন অভিযোগের কথা জানা যায়। পরিদর্শনকালে হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মচারীদের উপস্থিতি, রোগীবাহী গাড়ির দায়িত্ব পালন, ওষুধ সরবরাহ এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। হাসপাতালের কয়েকটি খাতে ব্যয় ও বিল-ভাউচার তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কেও অভিযোগ পাওয়া যায়।

সাংবাদিকদের কাছে স্থানীয় কয়েকজন অভিযোগ করে বলেন, হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করা কিছু কর্মচারীর প্রভাব রয়েছে। তাঁদের দাবি, হাসপাতালের প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রমের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এসব কর্মচারীর ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হাসপাতালের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মচারী, যিনি স্থানীয়ভাবে ‘বড় বাবু’ নামে পরিচিত, এবং ক্যাশিয়ারকে ঘিরে আর্থিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। ক্যাশিয়ার ও বড় বাবু সামান্য হাসপাতালে কর্মরত অবস্থায় বিলাসবহুল বাড়ী নির্মাণ করে এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করছে। তাঁদের দাবি, হাসপাতালের কিছু কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পরিবর্তে ওই কর্মচারীদের প্রভাব ও দাপট বেশি বলে মনে হয়।

তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের বক্তব্য এবং তাঁদের দায়িত্বের পরিধি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া প্রয়োজন। তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রশাসনিক নথি, আর্থিক হিসাব ও দায়িত্ব বণ্টনের তথ্য যাচাই জরুরি।

ভুয়া বিল-ভাউচারে সরকারি অর্থ উত্তোলনের অভিযোগঃ- হাসপাতালের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ উত্তোলনের বিষয়টি।

অভিযোগ রয়েছে, নামে-বেনামে টেন্ডার, আপ্যায়নসহ বিভিন্ন খাতের বিল তৈরি করে সরকারি কোষাগার থেকে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। এসব বিলের বিপরীতে প্রকৃতপক্ষে কাজ সম্পন্ন হয়েছে কি না, পণ্য বা সেবা সরবরাহ করা হয়েছে কি না এবং ব্যয়ের যথাযথ প্রমাণ রয়েছে কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।

এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নওশাদ খানের বক্তব্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে তিনি ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের কথা স্বীকার করেন এবং এ ধরনের কার্যক্রমকে নিয়মবহির্ভূত বলে উল্লেখ করেন বলে জানা গেছে। তবে কোন খাতে কত টাকা উত্তোলন করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট বিলগুলো কারা প্রস্তুত করেছেন, কার অনুমোদনে অর্থ ছাড় হয়েছে এবং অর্থ উত্তোলনের সঙ্গে কারা জড়িত—এসব বিষয়ে সুনিদিষ্ট কোন তথ্য দিতে পারিনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।। হাসপাতালের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন ডা, নুয়েনখীসা কে একাধিকবার ফোন করে কোন তথ্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। বিষয়টি উধর্তন কর্তৃপক্ষ পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য এলাকাবাসী দাবী জানিয়েছেন।