১৫ বছর পর রিজার্ভ বাজার জামে মসজিদের নির্বাচন; কেমন নেতৃত্ব চান মুসল্লিরা


আলমগীর মানিক    |    ০৪:৩৫ পিএম, ২০২৬-০৮-৩০

১৫ বছর পর রিজার্ভ বাজার জামে মসজিদের নির্বাচন; কেমন নেতৃত্ব চান মুসল্লিরা

আলমগীর মানিক

দেড় দশক পর ভোটের মুখে রাঙামাটি শহরের  রিজার্ভ বাজার জামে মসজিদ। দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর পর নির্বাচন হতে যাচ্ছে রাঙামাটির ঐতিহ্যবাহী রিজার্ভ বাজার জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির। আগামী সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠেয় এ নির্বাচন ঘিরে মুসল্লিদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। তবে নির্বাচনকে ঘিরে সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে মসজিদের বিপুল সম্পদ, মাসিক আয়, দীর্ঘদিনের বকেয়া এবং সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে।

প্রায় ৩০ হাজার বর্গফুট সম্পত্তি আর মাসে পাঁচ লাখ টাকার বেশি আয় থাকা এই মসজিদের বকেয়া আবার প্রায় ৪০ লাখ টাকা। দীর্ঘদিনের অনাদায়ী পাওনা, সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা ও আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্নের মধ্যেই আগামী সেপ্টেম্বরে নির্বাচন। মুসল্লিদের চাওয়া; এবার এমন নেতৃত্ব, যারা মসজিদের সম্পদকে আমানত মনে করে পরিচালনা করবেন।

সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রিজার্ভ বাজার জামে মসজিদের প্রায় ৩০ হাজার বর্গফুট সম্পত্তি রয়েছে। এর মধ্যে মূল মসজিদ ভবন, স্টাফ কোয়ার্টার, দোতলা ভবনসহ বিভিন্ন স্থাপনা রয়েছে। এ ছাড়া মসজিদের মালিকানাধীন রিজার্ভ বাজারের দুটি মার্কেটও পরিচালনাধীন। এসব সম্পত্তির ভাড়া, বাসাভাড়া, দানসহ বিভিন্ন উৎস থেকে মাসে পাঁচ লাখ টাকার বেশি আয় হয়। কোনো কোনো হিসাবে মাসিক আয় প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা।

অন্যদিকে কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ, পানি, রক্ষণাবেক্ষণসহ বিভিন্ন খাতে মাসে প্রায় আড়াই লাখ টাকা ব্যয় হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। মসজিদের কাজে পাঁচজন এবং কমপ্লেক্সের বিভিন্ন কাজে আরও ছয়জন কর্মী রয়েছেন। এ ছাড়া প্রতি জুমায় দান হিসেবে প্রায় ছয় থেকে সাত হাজার টাকা এবং পাঁচ-ছয় মাস পরপর দানবাক্স থেকে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা পাওয়া যায় বলে জানা গেছে।

বিপুল সম্পদ ও নিয়মিত আয় থাকলেও মসজিদের বিভিন্ন খাতে বর্তমানে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্যে জানা গেছে। এর বড় একটি অংশ দুই থেকে আড়াই দশক ধরে অনাদায়ী বলে দাবি করা হচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে এত বিপুল পরিমাণ বকেয়া পড়ে থাকায় অতীতে দায়িত্ব পালন করা কমিটিগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন মুসল্লিরা। তাদের প্রশ্ন; মসজিদের পাওনা নিয়মিত আদায় করা হয়নি কেন? দীর্ঘদিনের বকেয়া আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন? আর আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্রে কতটা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ছিল?

স্থানীয় মুসল্লিদের অভিযোগ, মসজিদের সম্পত্তির ভাড়া ও অন্যান্য পাওনা নিয়মিত তদারকি করে সময়মতো আদায় করা হলে বকেয়ার পরিমাণ এতটা বাড়ার কথা নয়। নতুন কমিটির কাছে তাই দীর্ঘদিনের বকেয়া আদায়কে অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন তারা।

মসজিদের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি দুই বছর পরপর পরিচালনা কমিটির নির্বাচন হওয়ার কথা। কিন্তু প্রায় দেড় দশক ধরে কোনো নির্বাচন হয়নি। দীর্ঘ সময় নির্বাচন না হওয়ায় মসজিদ পরিচালনা, সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা এবং আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় মুসল্লিরা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে স্থানীয় মুসল্লিদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন জেলা প্রশাসক হাবিবুল্লাহ একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে দেন। ওই কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় এক বছর পর এবার নির্বাচনের আয়োজন করা হচ্ছে।

নির্বাচন সামনে রেখে গত কয়েক মাসে নতুন করে ভোটার তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এবার প্রায় সাড়ে ৯০০ মুসল্লি ভোটার হয়েছেন।

মসজিদের গঠনতন্ত্রে কমিটির মেয়াদ দুই বছর উল্লেখ থাকলেও জেলা প্রশাসকের গঠিত আহ্বায়ক কমিটির অধীনে এবং মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০২৫ অনুযায়ী অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে নির্বাচিত কমিটির মেয়াদ তিন বছর হবে বলে জানা গেছে।

নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন পদে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ দুটি পদে মধ্যে সভাপতি পদে জাহাঙ্গীর আলম মেসি, সাবেক কাউন্সিলর হেলাল উদ্দিন ও বিআলম ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী রোকন উদ্দিনের নাম আলোচনায় রয়েছে।

সাধারণ সম্পাদক পদে বিশিষ্ট্য ব্যবসায়ি হাজী মাহফুজ ও তৈয়বিয়া আইডিয়াল কিন্ডারগার্টেনের প্রিন্সিপাল আক্তার হোসেন এর নাম শোনা যাচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত কারা প্রার্থী হচ্ছেন, তা নির্বাচনী প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হওয়ার পরই স্পষ্ট হবে।

রিজার্ভ বাজারের অন্যতম প্রধান এই মসজিদে প্রতিদিন প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করেন। জুমার দিনে মুসল্লির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় দেড় থেকে দুই হাজারে। ফলে ধর্মীয় উপাসনালয়ের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সামাজিক জীবনেও মসজিদটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

স্থানীয় মুসল্লিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা নতুন কমিটিতে শুধু সামাজিক বা কোনো পক্ষের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দেখতে চান না। তাদের প্রত্যাশা; সৎ, ন্যায়পরায়ণ, যোগ্য, দায়িত্বশীল ও আমানতদার ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত হবে নতুন নেতৃত্ব।

মুসল্লিদের মতে, নতুন কমিটির অন্যতম প্রথম কাজ হওয়া উচিত মসজিদের সম্পদের পূর্ণাঙ্গ হিসাব তৈরি করা। পাশাপাশি আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছ বিবরণ নিয়মিত প্রকাশ, সম্পত্তির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘদিনের বকেয়া আদায়ে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

মসজিদের মালিকানাধীন মার্কেট ও অন্যান্য সম্পত্তির ভাড়া আদায়েও নিয়মিত ও কার্যকর ব্যবস্থা চান তারা। ভাড়াটিয়ারা যাতে সময়মতো ভাড়া পরিশোধ করেন এবং দীর্ঘদিন বকেয়া থাকলে তা আদায়ে কমিটি যাতে দায়িত্বশীল ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয় সেটিও নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন মুসল্লিরা।

তাদের আরও দাবি, মসজিদের সম্পদ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহারের সুযোগ থাকা উচিত নয়। সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা ও ভাড়া আদায়ে সুস্পষ্ট নীতি, নিয়মিত হিসাব প্রকাশ এবং স্বার্থের সংঘাত এড়াতে কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

স্থানীয় মুসল্লিদের একটি বড় প্রত্যাশা হলো, নতুন নেতৃত্ব ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীন এই মসজিদটিকে আরও আধুনিক, দৃষ্টিনন্দন ও মুসল্লিবান্ধব করে গড়ে তুলবে। তারা জানান, মসজিদের নিজস্ব সম্পদ ও আয় সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করতে পারলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে আরও বেশি অর্থ ব্যয় করা সম্ভব। পাশাপাশি সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সহযোগিতা নিয়ে মসজিদের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

মুসল্লিদের প্রত্যাশা, নতুন কমিটি শুধু নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং মসজিদের সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ, আয় ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা, বকেয়া আদায়, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা কাজে লাগিয়ে মসজিদটিকে আরও সুন্দর ও আধুনিক করে তুলবে।

দীর্ঘ ১৫ বছর পর অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচন তাই মুসল্লিদের কাছে কেবল একটি নতুন পরিচালনা কমিটি গঠনের নির্বাচন নয়। তাদের দৃষ্টিতে, এটি দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে মসজিদের বিপুল সম্পদ ও আয়-ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। নতুন কমিটির সামনে থাকবে এসব বড় চ্যালেঞ্জ। মুসল্লিদের প্রত্যাশা, নির্বাচনের মাধ্যমে এমন নেতৃত্বই আসবে, যারা মসজিদের সম্পদকে আমানত হিসেবে রক্ষা করবেন এবং ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মুসল্লিদের আস্থা ও বিশ্বাসের মর্যাদা রাখবেন।