রাঙামাটিতে যৌতুকের মামলায় স্বামীর ৩ বছরের কারাদণ্ড, ২ লাখ টাকা জরিমানা


আলমগীর মানিক    |    ১১:৫৫ পিএম, ২০২৬-০৮-২৩

রাঙামাটিতে যৌতুকের মামলায় স্বামীর ৩ বছরের কারাদণ্ড, ২ লাখ টাকা জরিমানা

যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে মারধর, নির্যাতন ও সংসার থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় মো. আরমান হোছাইন (২৯) নামে এক ব্যক্তিকে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন রাঙামাটির নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল।

একই সঙ্গে তাকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

রোববার (২৩ আগস্ট ২০২৬) বিকেলে রাঙামাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ মাহাবুবুর রহমান এ রায় ঘোষণা করেন।

রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

মামলার নথি অনুযায়ী, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলাটি নারী ও শিশু মামলা নম্বর-৬৬/২৩ হিসেবে নথিভুক্ত হয়।

এতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর ১১(গ)/৩০ ধারায় অভিযোগ আনা হয়।

মামলার বাদী মোছা. মিনুয়ারা আক্তার (৩০) এবং প্রধান আসামি তার স্বামী মো. আরমান হোছাইন।

মামলার আরজি সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ২৪ ডিসেম্বর ইসলামী শরিয়ত ও সামাজিক রীতিতে পাঁচ লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করে আরমান হোছাইনের সঙ্গে মিনুয়ারা আক্তারের বিয়ে হয়। তাদের সংসারে সন্তান রয়েছে।

বাদিনীর অভিযোগ, বিয়ের প্রায় পাঁচ-ছয় মাস পর থেকেই আসামিরা যৌতুকের জন্য তাকে চাপ দিতে থাকেন।

সংসার টিকিয়ে রাখার আশায় তিনি তার বাবার কাছ থেকে কয়েক দফায় মোট ৫ লাখ ৮ হাজার টাকা এনে দেন।

পরবর্তীতে স্বামী বিদেশে যাওয়ার কথা বলে তার কাছে আরও ২ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন।

মামলার আরজিতে আরও উল্লেখ করা হয়, দাবিকৃত টাকা দিতে অপরাগতা প্রকাশ করলে বাদিনীকে স্বামীর বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়।

পরে সন্তানকে নিয়ে ২০২২ সালের ১৫ জানুয়ারি তিনি তার ভগ্নিপতির বাড়িতে আশ্রয় নেন।

এরপর স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে সংসার করার চেষ্টা করলেও দাবিকৃত দুই লাখ টাকা না দিলে তাকে আর সংসারে নেওয়া হবে না বলে জানানো হয়।

নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৫ জুন আসামি আরমান হোছাইন বাদিনীর বর্তমান ঠিকানা অর্থাৎ তার ভগ্নিপতির বাড়িতে আসেন।

এরপর ১২ জুন ২০২৩ সকাল আনুমানিক ৮টার দিকে বাদিনী স্বামীকে সংসার করার অনুরোধ করলে আরমান পুনরায় দুই লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন।

এ নিয়ে উভয়ের মধ্যে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে আরমান বাদিনীকে এলোপাতাড়ি কিল, ঘুষি ও লাথি মারেন বলে মামলার আরজিতে অভিযোগ করা হয়।

একপর্যায়ে তার চুলের মুঠি ধরে মাটিতে ফেলে বুকে ও পেটে লাথি মারারও অভিযোগ রয়েছে।

বাদিনীর চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন ও সাক্ষীরা এগিয়ে এসে তাকে আসামির হাত থেকে রক্ষা করেন বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরে স্থানীয় হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়ার পর থানায় মামলা করতে গেলে বাদিনীকে হয়রানির শিকার হতে হয় বলে মামলার আরজিতে অভিযোগ করা হয়।

এরপর ন্যায়বিচারের আশায় তিনি রাঙামাটির নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের শরণাপন্ন হন।

মামলার নথিতে বাদিনীসহ একাধিক সাক্ষীর নাম উল্লেখ রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণ ও শুনানি শেষে আদালত আসামি মো. আরমান হোছাইনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে সিদ্ধান্ত দেন।

পরে রোববার বিচারক তাকে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও দুই লাখ টাকা জরিমানা করেন।

রায়ের বিষয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মাকসুদা হক বলেন, যৌতুকের মতো সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ সবসময় কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আইন অনুযায়ী তাকে সাজা দেওয়া হয়েছে।

এ ধরনের রায় সমাজে যৌতুক ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে ইতিবাচক বার্তা দেবে।

রায় ঘোষণার পর দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মো. আরমান হোছাইনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

রায়ের পর আদালতের প্রতি সন্তুষ্টি ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন মামলার বাদী ও ভুক্তভোগী মিনুয়ারা আক্তার।

তিনি বলেন, “আমি আদালতের প্রতি কৃতজ্ঞ। দীর্ঘদিন পর আমি ন্যায়বিচার পেয়েছি। এ রায়ে আমি সন্তুষ্ট।”

মামলাটি পরিচালনায় রাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মাকসুদা হাবিবের আন্তরিকতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

মিনুয়ারা বলেন, “সরকারি কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট মাকসুদা হক অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে মামলাটি পরিচালনা করেছেন।

তার আন্তরিক প্রচেষ্টা ও আদালতের ন্যায়বিচারের কারণে আমি আমার অধিকার পেয়েছি।”

তিনি আরও বলেন, আমি চাই, আমার সঙ্গে যে ঘটনা ঘটেছে, তা যেন আর কোনো নারীর জীবনে না ঘটে।

যৌতুক ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে এ ধরনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ কমাতে ভূমিকা রাখবে।

এ রায়ের জন্য আমি আদালতের প্রতি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।